চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২৮ মাঘ ১৪২৭, ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন
এইচএম জাকির
১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


'মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা' অতুল প্রসাদ সেনের কবিতার এই চরণটি প্রতিটি বাঙালিরই মনের কথা। মা, মাতৃভূমি ও মায়ের ভাষা_এই তিনে মানুষ খুঁজে পায় জন্মের সার্থকতা। নিজের মুখের ভাষার চেয়ে মধুর আর কিছুই হতে পারে না। বাঙালি বায়ান্ন সালে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে শত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিলো তাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার অধিকারকে বুকের রক্ত দিয়ে আপন করে নেয়ার রেকর্ড শুধুমাত্র বাঙালিরই। যারা বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত করেছিলো রাজপথ। রফিক, সালাম, বরকত, শফিউলসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তস্নাত এই অর্জন বিশ্বে বাঙালিকে অমর করে রেখেছে। যতোদিন লাল-সবুজের পতাকাখচিত এই বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু নামটি থাকবে, ততোদিন পৃথিবীর বুকে বাংলা ভাষা আপন মহিমায় চির জাগরুক থাকবে।



 



মুসলিম লীগের কুচক্রে প্রভাবিত হয়ে কংগ্রেসের ভুল সিদ্ধান্তে ১৯৪৭ সালে শাসকগোষ্ঠী ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি করলে তৎকালীন ইস্টবেঙ্গল বা পূর্ব বাংলা নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান' নাম ধারণ করে। এ সময় পাকিস্তানের শাসনভার (গভর্নর জেনারেল) পরিচালনা করেন মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালেই দেশভাগের পক্ষে প্রস্তাব পাস করে, যা লাহোর প্রস্তাব নামে অধিক পরিচিত।



 



ভারত থেকে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হলেও দুই ভাষা-ভাষীর কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অর্থাৎ বাঙালি জাতি তা মেনে নিতে পারেনি। ১৯৪৭ সালেই বৃটিশ রাজ্যের অবসানের পর পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরের মধ্যেই আন্দোলনে নামতে হয় বাঙালিদের। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে বাঙালির কাছ থেকে ভাষার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিলো। তারা চেয়েছিলো সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে এই বাংলায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে বলেন, 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর এহেন বক্তব্যসহ তাদের সেই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৎকালীন ছাত্রনেতা বাঙালির ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ ভাষাপ্রেমী ছাত্ররা। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিসহ ১৯৪৭ সালে কলকাতার সিরাজুদ্দৌলা হোটেলে পূর্ব পাকিস্তানের পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণে সমবেত হয়েছিলো কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী। সেখানে পাকিস্তানে একটি অসামপ্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তানের কর্মীসম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। সেই সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। 'ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা' বিষয়ক গাজীউল হকের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। প্রস্তাবগুলো ছিলো, 'বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।' এভাবেই ভাষার দাবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ববাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর সরাসরি ভাষা আন্দোলনে শরিক হন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সমকালীন রাজনীতিবিদসহ ১৪ জন ভাষাবীর সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবিসংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলেন। ওই ইশতেহারে ২১ দফা দাবির মধ্যে দ্বিতীয় দাবিটি ছিলো রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ঐতিহাসিক এই ইশতেহারটি একটি ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছিলো, যার নাম 'রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইশতেহার-ঐতিহাসিক দলিল'। ওই পুস্তিকাটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এই ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিলো অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা।



 



ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলির 'ওয়ার্কার্স ক্যাম্প' ছিলো সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র-যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীদের মিলনকেন্দ্র। ভাষা আন্দোলনের সপক্ষের কর্মীবাহিনী এখানে নিয়মিত জমায়েত হতো এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার নানা কর্মপরিকল্পনা এখানেই নেয়া হতো। শেখ মুজিব, শওকত আলী, কামরুদ্দিন আহমদ প্রমুখ নেতা ছিলেন এই ক্যাম্পের প্রাণশক্তি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ১৫০ মোগলটুলি বিরোধী রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কলকাতা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, জহিরুদ্দিন, নইমুদ্দিনের মতো নেতারা প্রথমে ১৫০ মোগলটুলিতেই জমায়েত হতেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই সংগঠনটির ভূমিকা খুবই স্মরণীয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম দাবি ছিলো রাষ্ট্রভাষা বাংলা, সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা।



 



১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তমুদ্দিন মজলিসের আহ্বানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তমুদ্দিন মজলিসপ্রধান অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপ্রধানে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে দলে দলে এ সমাবেশে যোগদান করে। এ ধর্মঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহসী ভূমিকা রাখেন। ওইদিন মিছিলের সমগ্র ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথসভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। এই সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, মুহাম্মদ তোয়াহা, আবুল কাসেম, রণেশ দাশগুপ্ত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। সভায় গণপরিষদের সিদ্ধান্ত ও মুসলিম লীগের বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এতে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমুদ্দিন মজলিস, ছাত্রাবাসগুলোর সংসদ প্রভৃতি ছাত্র ও যুব প্রতিষ্ঠানের দুজন করে প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। এই পরিষদ গঠনে শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন।



 



১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এইদিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। এটাই ছিলো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এদেশে প্রথম সফল হরতাল। এই হরতালে তরুণ শেখ মুজিব নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেফতার হন। ভাষাসৈনিক অলি আহাদ তার 'জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫' গ্রন্থে লিখেছেন, 'আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার নিমিত্তে শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ হতে ১০ মার্চ ঢাকায় আসেন। পরের দিন হরতাল কর্মসূচিতে যুবক শেখ মুজিব এতটাই উৎসাহিত হয়েছিলেন যে, এ হরতাল তার জীবনের গতিধারা নতুনভাবে প্রবাহিত করে।' মোনায়েম সরকার সম্পাদিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি' শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছে, 'স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই তার প্রথম গ্রেফতার।' ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে জেলখানায় আটক ভাষা আন্দোলনের কর্মী রাজবন্দিদের চুক্তিপত্রটি দেখানো হয় এবং অনুমোদন নেয়া হয়। কারাবন্দি অন্যদের সঙ্গে শেখ মুজিব চুক্তির শর্ত দেখেন এবং অনুমোদন প্রদান করেন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত লাভ করেছিলো এবং চুক্তির শর্ত মোতাবেক শেখ মুজিবসহ অন্য ভাষাসৈনিকরা কারামুক্ত হন। ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে এক সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বানে নইমুদ্দিন আহমদের সভাপ্রধানে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় শেখ মুজিব অংশগ্রহণ করেন। ওইদিন দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদ, মুহাম্মদ তোয়াহা, নইমুদ্দিন আহমদ, শওকত আলী, আবদুল মতিন, শামসুল হক প্রমুখ যুবনেতার কঠোর সাধনার ফলে বাংলা ভাষার আন্দোলন সমগ্র পূর্ববাংলায় একটি গণআন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। জনসভা, মিছিল আর সস্নোগানে সমগ্র বাংলাদেশ যেনো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। রাস্তায়, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টারে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েও বঙ্গবন্ধু দুবার গ্রেফতার হয়েছিলেন।



 



১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ-পর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকলেও জেলেবসেও নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করতেন। এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, '১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেফতার হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনকারী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন।' রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যারা নেতৃত্বে ছিলেন যেমন, আবদুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান, কামরুজ্জামান, আবদুল মমিন তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে এবং পরে হাসপাতালে থাকাকালীন আন্দোলন সম্পর্কে চিরকুটের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠাতেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 'একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা' প্রবন্ধে লিখেছেন, 'শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়ে আন্দোলনের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন'।



 



জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি দেন। সোহরাওয়ার্দী এই অবস্থানে দৃঢ় থাকলে ভাষা আন্দোলন অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারতো। এই ধারণা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর মত পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার সমর্থন আদায় করেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, 'সে সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষা-সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা বেশ অসুবিধায় পড়েছি। তাই ওই বছর জুন মাসে আমি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য করাচি যাই এবং তার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংলা ভাষার দাবির সমর্থনে তাকে একটি বিবৃতি দিতে বলি। ফলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে সমর্থন করে বিবৃতি দেন।' ওই বিবৃতিটি ১৯৫২ সালের ২৯ জুন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় মাওলানা ভাসানীর একটি বিবৃতিও প্রকাশিত হয়। বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'বাংলা ভাষার পক্ষে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত পরিবর্তনে শেখ মুজিবুর রহমান সক্ষম না হলে শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তো।' ২৭ এপ্রিল ১৯৫২ তারিখে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জেলা ও মহকুমা প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খান ওই সভায় সভাপতিত্ব করার সময় অসুস্থতাবসত এক পর্যায়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এ পর্যায়ে সভাপতির লিখিত ভাষণ পাঠ করেন কামরুদ্দিন আহমদ। ওই প্রতিনিধি সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান।



 



১৯৫২ সালের পরও বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষাকে ছেড়ে যাননি। ভাষা আন্দোলনের সফলতার পর্বে তার অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদান, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন, সংসদের দৈনন্দিন কার্যাবলি বাংলায় চালু প্রসঙ্গে তিনি আইনসভায় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী পালনেও বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট ভূমিকা ছিলো। সেদিন সব আন্দোলন, মিছিল এবং নেতৃত্বের পুরো ভাগে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান এবং অবিলম্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট প্রণীত ২১ দফার প্রথম দফা ছিল, 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সমকালীন রাজনীতি এবং বাংলা ভাষার উন্নয়নে অবদান রাখেন। ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আইন পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদের দৈনন্দিন কর্মসূচি বাংলা ভাষায় মুদ্রণ করার দাবি জানান। ৭ ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে তিনি খসড়া শাসনতন্ত্রের অন্তর্গত জাতীয় ভাষা-সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, 'পূর্ববঙ্গে আমরা সরকারি ভাষা বলতে রাষ্ট্রীয় ভাষা বুঝি না। কাজেই খসড়া শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রের ভাষা সম্পর্কে যেসব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা কুমতলবে করা হয়েছে। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ৫৬ ভাগ লোকই বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রশ্নে কোনো ধোঁকাবাজি করা যাবে না। পূর্ববঙ্গের জনগণের দাবি এই যে, বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হোক। ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে আইনসভার অধিবেশনেও তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।' এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রথম সংবিধানে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।



 



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান প্রণীত হয়। এটি ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। যে সংবিধানে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অফিসের কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জারিকৃত এক আদেশে বলা হয়, 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।'



 



বাংলা ভাষা আজ দেশের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। আজ পৃথিবীর সব রাষ্ট্র শুধু দিবসটি পালন করছে তা নয়, বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মাতৃভাষার জন্যে বাঙালির ঐতিহাসিক আত্মত্যাগকে। বঙ্গবন্ধুর সাহসী নেতৃত্বে মাতৃভাষার জন্যে সেদিন যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিলো, সে চেতনায় ধাবিত হয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যতকাল লেখা হবে, পড়া হবে, বলা হবে; ততকাল বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে বার বার ফিরে ফিরে আসবে। মহান এই নেতার ১০০তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিরন্তর।



 



 



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২-সূরা বাকারা


২৮৬ আয়াত, ৪০ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৭৯। সুতরাং দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, 'ইহা আল্লাহর নিকট হইতে।' তাহাদের হাত যাহা রচনা করিয়াছে তাহার জন্য শাস্তি তাহাদের এবং যাহা তাহারা উপার্জন করে তাহার জন্য শাস্তি তাহাদের।


 


 


 


assets/data_files/web

আত্মার সৌন্দর্য মানুষকে পরিপূর্ণতা দান করে। _টমাস ফুলার।


 


 


যে ব্যক্তি প্রথম সালাম দেয়, সে অহঙ্কার মুক্ত।


 


 


ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৭,৫১,৬৫৯ ১৬,৮০,১৩,৪১৫
সুস্থ ৭,৩২,৮১০ ১৪,৯৩,৫৬,৭৪৮
মৃত্যু ১২,৪৪১ ৩৪,৮৮,২৩৭
দেশ ২০০ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
১৮৫৭৪১২
পুরোন সংখ্যা