চাঁদপুর, শুক্রবার ১৭ জুলাই ২০১৫ | ২ শ্রাবন ১৪২২ | ২৯ রমজান ১৪৩৬
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
লালন শাহ : অভেদ আত্মার সেতুবন্ধন
শাহ বুলবুল
১৭ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


সম্ভবতঃ 'বাতুল' শব্দ থেকে 'বাউল' শব্দের আগমন। মতবাদীদের বিচারে সে যা হোক এটা নিশ্চিত যে, মুসলমান মাধব বিবি ও আউল চাঁদ নামক দুজন সংসার বিবাগী মানুষ 'বাউল' মতের প্রবর্তক। ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে বাউল মতের জন্ম হলেও ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তা একটি পরিপূর্ণ মতবাদের আকার ধারণ করে। বাউল মতের সৃষ্টি বিষয়ক মতবাদীদের বক্তব্য হচ্ছে : বৈষ্ণব ও মুসলমান ফকিরদের যৌথ ধর্ম হিসেবে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এটার জন্ম ও বিকাশ ঘটে। এটাকে অনুমেয় সময় ধরা হয়। অনুমেয় ও শাস্ত্রীয় বক্তব্য ছাড়াও অনেকে মনে করেন, ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বাউল ধর্মের সূচনা এবং ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অথাৎ ২৬০বছর কালব্যাপী এ ধর্মের উৎপত্তি, বিকাশ ও বিস্তৃতি ।



বাউল শব্দটির স্পর্শেই শত যান্ত্রিক আর সাংসারিক যন্ত্রণা দূরে সরে মনে ভাসে মানবতাবাদী ও মরমী এক নিষ্পাপ অবয়ব। মনে করা হয়, হিন্দু-মুসলিম ও বৌদ্ধ ধর্মের নিম্নস্তরের নিঃস্ব এক শ্রেণির মানুষই সাধারণত 'বাউল'। এরা সচরাচর ভিক্ষাজীবী। দেশ-সমাজ, রাষ্ট্র-লোকাচার, সম্মান, প্রতিপত্তি, লোভ-লালসা সকল উপাদানের ঊর্ধ্বে বাউলেরা 'জীয়ন্তে মৃতে'র প্রতিবিম্ব। বাউল মতের জনক মাধব বিবি ও আউল চাঁদ হলেও এদের শিষ্য নিত্যানন্দ ও পুত্র বীরভদ্র 'বাউল' মতকে মানব মানসে প্রত্যাশা, পবিত্র ও প্রত্যয়ের মাঝে এক অনন্য জীবনের প্রতিচিত্র হিসেবে তুলে ধরেন। মূলতঃ এ সময়ই বাউল মতবাদ জনপ্রিয়তার পরশ পাথরে সর্বদিক জয় করে নেয়। বাউলেরা কোন শাস্ত্র, বই পুস্তক বা প্রচলিত ধর্মের ধার ধারেনি। মানব ধর্মই এদের পরম উপাস্য। মাটি ও মানুষের গানই এদের প্রাণ এবং জীবন-জীবিকার একমাত্র সম্বল। বাউল পথিক সাধনে-ভজনে-গানে- লোক কবিতায় অশান্ত পৃথিবীকে শান্তি ও প্রেমের ডাক দিয়ে যায়। আবহমান কাল ধরে বাঙালির মননে যে মরমীয়াবাদ পালন হচ্ছে সেই সাধনায় সকল ধর্ম-বর্ণের এবং সর্বকালের ভাব নিঃসৃত এক নাম 'লালন শাহ'; যাকে বাউল সমাজ ও সমপ্রদায়ের মুকুটহীন সম্রাট বলে মেনে নেওয়া হয়েছে।



'বাউল সম্রাট লালন শাহ।' জন্ম ও জীবন নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গ্রন্থ, তথ্যচিত্র, চলচ্চিত্র। তার জীবন ও জন্ম নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আখ্যান । ফলে এই মুকুটবিহীন সম্রাটের জীবন ও জিজ্ঞাসা আজও রহস্য পাহাড়ের ওপারে দেখা ঐ বৃক্ষের মতোই। কেউ বলে, লালন 'কায়স্থ' সন্তান। কেউ বলে 'কর'। আবার কেউ কেউ 'দাশ' বলে দাবি করেছেন। তবে লালন শাহের জন্ম সম্পর্কিত সর্বাধিক সমর্থিত মতটি হচ্ছে : বাউল লালন শাহ এক সাধারণ হিন্দু ঘরে জন্ম নেওয়া হিন্দু সন্তান। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত অনুমান ও অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, কুমারখালীর কোনো এক গাঁয়ে ১৭৭৪ সালে লালন শাহ জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর শুক্রবার ১১৬ বছর বয়সে সেঁউড়িয়া গ্রামে এই বাউল সম্রাট ইহ জগৎ ত্যাগ করেন। বর্তমানে সেঁউড়িয়া গ্রামে লালন শাহের মাজার অবস্থিত।



জীবন সড়কের শুরুতে ঘটে যাওয়া একটি মাত্র ঘটনার স্ফুলিঙ্গে জ্বলে-পুড়ে সোনা হয়েছেন লালন শাহ। শ্রম, সাধনা আর চর্চার বাহুতে ভর করে হয়েছেন বাউল সমপ্রদায়ের মুকুটহীন সম্রাট। অল্প বয়সে বিয়ে করা লালন একদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তীর্থ দর্শনে যান। তীর্থ দর্শন শেষে বাড়ি ফেরা পথিক লালন শাহ পথেই মারাত্মক বসন্ত রোগের মুখে পতিত হয়। বসন্তে আক্রান্ত লালন শাহকে সহযাত্রীরা পথের মাঝেই অসহায় ভাবে রেখে যান। এমতাবস্থায় সিরাজ ফকির নামক এক নিঃসন্তান পালকী বাহক মৃত্যু পথের পথিক লালন শাহকে ঘরে নিয়ে আসে। পালকী বাহক সিরাজ ফকির ও তার স্ত্রীর সেবা শুশ্রূষায় লালন তিলে তিলে সুস্থ হয়ে উঠলেও তার এক চোখ অন্ধ হয়ে যায়। এদিকে লালনের সহযাত্রীরা বসন্ত আক্রান্ত লালন শাহকে পথে ফেলে গিয়ে এলাকায় প্রচার করেন যে, বসন্ত রোগে লালন মারা গেছে। সুস্থ হয়ে লালন কুমারখালীর নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু মুসলমান হাতে সেবা পেয়ে নতুন জীবন প্রাপ্ত লালনকে তার হিন্দু সমাজ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। মুসলমান হাতের সেবা গ্রহণে লালনের ধর্ম বিকিয়ে গেছে এমন অভিযোগে লালন শাহের পরিজন এমনকি স্ত্রী পর্যন্ত লালনকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। জীবনের দুর্গম পথে ধর্মের এমন বৈরিতা লালনের মনকে ক্ষু্ব্ধ করে তোলে। সংসার পরিজনের এমন নিষ্ঠুর আচরণে জন্ম নেয় সংসার ধর্ম বিবাগী বিদ্রোহী সত্তার আরেক লালন। মুসলিম সেবা গ্রহণের অপরাধে সর্বহারা লালন নতুন জীবনের সন্ধানে পুনরায় সিরাজ সাঁইয়ের কাছে আসেন এবং সাঁইকে গুরু পদে বরণ করে লিখতে বসেন বাউল জীবন ও বাউল সমপ্রদায়ের এক স্বর্ণগর্ভা অধ্যায়।



জানা যায়, স্বধর্ম কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত লালন সর্বহারা হয়ে নানা তীর্থ স্থান ও ধর্ম দর্শন করে আত্মার নিভৃত জমিনে যে নতুন মর্মের সন্ধান পান তার ভিত্তিতেই সাধনা ও চর্চার সম্ভার উর্বর করে বাউল সমপ্রদায়কে করেছেন অনেক অনেক সমৃদ্ধ। এভাবে নানা তীর্থ স্থান ভ্রমণ শেষে ১৮২৩ সালে সেঁউরিয়া গ্রামে জোল জাতের এক মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করে সেঁউরিয়া গ্রামেই বসবাস করতে থাকেন।



জীবনের চরম দুঃসময়ে স্বধর্ম ও স্বজনহারা বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহী বাউল সত্তা লালন শাহ কোনো ধর্মেই বিশ্বাসী হতে পারেননি। লালন শাহ আমৃত্যু মানবের স্নিগ্ধ জমিনে বসে গেয়ে গেছেন মানব প্রেমের গান। দর্শনে গানে বিলিয়েছেন মানবতাবোধের এক অমিয় সুধা। নিজের ভেতরে একটু একটু করে সাধনায় সৃষ্ট সংগীত ও দর্শনের সাথে মানব প্রেম মিশিয়ে গড়েছেন মানুষে মানুষে অভেদ আত্মার সেতু বন্ধন। যেখানে জাত, ধর্ম, কুলাচার, বিভেদ, বৈষম্যের স্পর্শও নেই। বাউল সম্রাট লালন দর্শনের জ্যান্ত সাক্ষাৎ প্রমাণ মুসলিম বাউলের হিন্দু শিষ্য আর হিন্দু বাউলের মুসলমান শিষ্য। জানা যায়, বাউল মনাই শেখের শিষ্য ছিল কালা চাঁদ মিস্ত্রি এবং কালা চাঁদ মিস্ত্রির শিষ্য হারাই ছিল নমশূদ্র এবং তার শিষ্য দিনু ছিল জাতিতে নট। বাউল নিত্যনন্দের শিষ্য ছিল বলা কৈর্বত আবার বলা কৈর্বতের শিষ্য ছিল মাধা পটিয়াল, কাপালি এবং তার শিষ্য গঙ্গারাম ইত্যাদি।



লালন শাহকে বলা হয় বাউল সমপ্রদায়ের মুকুটহীন সম্রাট, কারণ তার হাতেই বাউল সমপ্রদায়ের সৃষ্টি ও সৃজনশীলতা সৌরভ ছড়িয়েছে আপন মহিমায়। বাউল মতবাদের সূচনা থেকে পূর্ণতা প্রাপ্তির ৩০০বছরের ইতিহাসে লালন শাহ এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা। নিশ্চিন্তে বলা যায়, লালন শাহের আগে কোনো বাউল তাদের মতে এত গৌরব ও সম্মান অর্জন করতে পারেননি। বাউল সমাজের এই অমূল্য ধন আমৃত্যু বাউল সংগীত ও সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ফলে ভিক্ষাজীবী বাউল সমপ্রদায়ে লালন শাহের আগমন ছিল অাঁধার ভাঙ্গা আলোর মহা প্রলয়। এ কথা সবারই জানা , আমাদের কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালন শাহের দর্শন ও গানের অনুরাগী ছিলেন। ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে হীবার্ট বক্তৃতায় লালন শাহের 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি' শিরোনামে বাউল তত্ত্ব বিষয়ে 'The man of my heart'-এ মূলত বাউল সম্রাট লালন শাহের কথাই স্বীকার করেছেন।



লালন শাহ প্রথাগত ধর্ম, আচার, মোহের অনেক অনেক ঊর্ধ্বে বসে নিজের ভেতর রচনা করেছেন আমার 'আমিত্ব' নামক এক অন্যরকম স্বর্গ, যাতে মানব প্রেম জন্ম নিতো অবরিত ফসলের নিত্য চাষাবাসে। ১১৬ বছরের জীবনে এই মহাপুরুষ মানব প্রেমে নিমজ্জিত হয়ে দেহতাত্তি্বক গানের সম্ভারকে করেছেন সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর। বাউল সম্রাটের গানের সংখ্যা কত এই নিয়ে বেশ মতান্তর থাকলেও মতিলাল দাশ, আনোয়ারুল করিম, ড. উপেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য, রিয়াজুল হক, ড. আশরাফ সিদ্দিকী-এর মতো লালন গবেষকরা লালনের গান সহস্রাধিক বলে অভিমত দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, লালন শাহ শুধু সহস্রাধিক গানেরই রচয়িতা ছিলেন না বরং সুরও দিয়েছেন মানুষের মন প্রাণ স্পর্শ করে। এই বাউল সম্রাটের হাতেই বাউল গানের ভিন্ন ধাঁচ ও নতুন ঘরানার এক লৌকিক সৌধ তৈরি হয়। বাউল সমপ্রদায়ের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব মুকুটহীন বাউল সম্রাট লালন ছিলেন উভয় বাংলার আড়াই লক্ষ বাউলের গুরু। এই বাউল গুরুর মরমীয়াবাদ আজও আমাদের অন্তরস্থলকে ভাব ও মানব প্রেমের এক অমিয় সুধায় আবিষ্ট করে রাখে।



বাউলগণ আনুষ্ঠানিক ধর্মকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে মানব ধর্মের মহান আভায় মিশেছেন স্বকালে ও স্বীয় মহিমায়। ঈশ্বর প্রেমে উভয়ের টান এক বিন্দুতে হলেও প্রচলিত ধর্মের আচার ও মৌলিক দিক সম্পর্কে বাউলগণ মোটেও আস্থাভাজন ছিলেন না। বাউলরা কোন কালেই কোরান, পুরাণ, বেদ, বাইবেল ইত্যাদির বাঁধনে বাঁধা পড়েননি। তথাপি স্রষ্টার প্রতি ছিল সবটুকু বিশ্বাস ও ভালোবাসা, যা পরম পুরুষের ভেতর দিয়ে সাধনায় ফুটে উঠে। লালন দর্শনেও আমরা স্রষ্টা ভক্তির পরিপূর্ণতা দেখতে পাই। বাউল সম্রাট মনে করতেন, উপাসনালয়ের সঙ্কীর্ণ প্রাচীর কিংবা ভজনালয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না। ঈশ্বরকে পেতে হলে চাই মানব প্রেম ও ভালোবাসার অন্বেষণ। বাউলরা মনে করেন, প্রাচীরে বাঁধানো মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা বা গির্জায় মানব মুক্তির সব দ্বার রুদ্ধ হয়ে আছে। তাইতো বাউল গানে চিরাচরিত বাঁধন ছেঁড়ার আহ্বান_



'তোমার পথ ঢ্যাকছে মন্দিরে-মসজিদে



ও তোর ডাক শুনে সাঁই চলতে না পাই



আমায় রুখে দাঁড়ায় গুরুতে মুরশিদে '।



আপন আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির মাধ্যমে পরম আরাধ্য ঈশ্বর খোঁজা বাউলদের প্রথম সাধনা। আর এই সাধনার মহাসড়ক হলো মানব প্রেমের গান। বাউলদের ভাষায়_



' বীণার নামাজ তারে তারে



আমার নামাজ কন্ঠে গাই।'



বাউল মতবাদের প্রথম সোপানই হচ্ছে সকল চিরাচরিত ধর্মকর্মের বাঁধন ছিন্নভিন্ন করে মানব প্রেম সাধনে আত্মার পরিচয় লাভ ও ঈশ্বর সন্ধান। বাউলরা মনে করেন, মুসলমান মীসত, হিন্দু দেহরা সুতরাং এখানে প্রভু নেই। এদের মতে, প্রভু বলেছেন-



' মোঁ কো কঁহা ঢুঁড়ো বন্দে মৈঁতো তেরে পাসমে।



না - মৈঁ দেবল, না সৈঁ মসজিদ, না কাবে কৈলাস মেঁ।'



লালন শাহের সাধনা, চর্চা সবই ছিল মানুষের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর প্রেমে প্রজ্বলিত। জীবনের প্রথম পদে রিদ্ধ অবিশ্বাস ও বাউল মন বরাবরই প্রচলিত শাস্ত্র ও ধর্মকর্মকে অস্বীকার করেছে। মানবের মাঝে ঈশ্বর সন্ধানী লালন শাহ তার গানের ছত্রে ছত্রে শাস্ত্র দ্রোহীতার মত প্রকাশ করে গেছেন। মানব প্রেমের প্রেমিক লালন শাহ আসমানী কিতাব সম্পর্কে বলেন-



'কি কালাাম পাঠাইলেন আমার সাঁই দয়াময়।



এক এক দেশে এক এক বাণী কয় খোদায় পাঠায়।



যদি একই খোদার হয় বর্ণনা



তাতে তো ভিন্ন থাকে না



মানুষের সকল রচনা



তাই তো ভিন্ন হয়।



এক এক দেশে এক এক বাণী



পাঠান কি সাঁই গুণমণি



মানুষের রচনা জানি



লালন ফকির কয়।'



ছুৎমার্গের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের কারও না কারও জীবনে একটু হলেও বিষ ছিটিয়েছে। এ জাতি ও জাতিকে ছোঁবে না, এ জাত ঐ জাতের ঘরে উঠলে লক্ষ্মী চিরজনমের জন্যে পালাবে অথবা জল ছুঁলেও তল যাবে ইত্যাদি। বর্বর থেকে সভ্য সময়ে পা রেখেও আমরা জাত বিচারের অসভ্য ব্যবসায় গুষ্ঠিসুদ্ধ উদ্ধারে মত্ত। জাত-পাতের বিষাক্ত ছোবলে ছিন্নভিন্ন হয়েছিল বাউল সম্রাট লালন শাহের প্রথম জীবন। তাই লালনকন্ঠে ছুৎমার্গ আর জাত বিচারের অসারতা প্রকাশ পেয়েছে_



'ভক্তির ধারে বাঁধা আছেন সাঁই



হিন্দু কি যবন বলে



তার জাতের বিচার নাই।'



এই সম্পর্কিত অন্য একটি গানে বলেছেন_



'জাত না গেলে পাইনে হরি



কি ছার জাতের গৌরব করি



ছঁসনে বলিয়ে।'



বাউল সাধনার যাপিত মালার প্রতি গোটাই দেহকে কেন্দ্র করে। তাই বাউল সাধনাকে দেহতাত্তি্বক সাধনাও বলা হয়। লালন শাহ তেমনি সাধনার শীর্ষ চূড়ায় মানব দেহকেই সাধনার পুণ্যতীর্থ বলে মেনে নিয়েছেন। বাউল সম্রাট লালন শাহের গানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দেহতাত্তি্বক গান বলা হয়। কারণ লালন মনে করতেন, এই দেহের মধ্যেই পরম মানুষের নিভৃত বসবাস। যে নিজেকে চিনবে ও জানবে সেই খুঁজে নিতে পারবে আত্মার ভেতরকার বসতীকে। আমরা দেখতে পাই, লালন শাহ তার গানে মানব দেহকে নানা উপমায় উপস্থাপন করেছেন। যেমন- 'ঘর', 'খাঁচা', ' আরশিনগর' ইত্যাদি। সব নাম ও ব্যাকুলতার আড়ালে লালন শাহ দেহ ঘরের অলিতে গলিতে পরম করুণাময়ের সন্ধান করেছেন। যা তার গানের ভাষায় আকুল হয়ে কাঁদে-



'আমার এ ঘর খানায় কে বিরাজ করে।



তারে জনম-ভর একদিন দেখলাম নারে।



নড়ে চড়ে ঈশান কোণে



দেখতে পাইনি এ নয়নে



হাতের কাছে যার



ভবের হাট বাজার



ধরতে গেলে হাতে পাইনে তারে।'



বাউল মন সব হারিয়ে খুঁজে ফেরে না পাওয়ার বন্দরে বন্দরে। কী যেন পেতে বা সেই চির মিলনের বাসনায়। জীবনের হিসাব যেখানে মিলেনি তার মিলন তৃষ্ণা সাহারার তপ্ত ইটপাথরের গায়েও কান্না জমায়। লালন শাহের গানেও সেই দূরেলা প্রেয়সীর মিলন তৃষ্ণায় সান্ধ্য পাখির মতো ডানা ঝাপটানি শুনা যায়। কিন্তু সে মিলন কি কুমারখালীর কোন এক গাঁয়ের মেঠো পথে ফেলে আসা প্রথম জীবন। নাকি সাধনায় সৃজিত মনের মানুষের সনে। কার সাথে মিলন বাসনায় কাতর লালন শাহের এ গান_



'মিলন হবে কত দিনে



আমার মনের মানুষের সনে।'



লালন শাহ তার দেহতাত্তি্বক গানে সংসারের নির্মম হিসাব-নিকাশ থেকে মানুষকে ভাবের জগতে ছিনিয়ে এনে ভাবনার আমূল পরিবর্তন চেয়েছেন। তাইতো ১১৬ বছরের জীবনে বারবার গানের প্রতি অক্ষরে দেহতত্ত্বের কথা এসেছে নানা ভাবে ও ঢংয়ে। যেমন_



'সখি গো জন্ম মৃত্যু যাহার নাই,



তাহার সঙ্গে প্রেম গো চাই।'



অথবা



'উপাসনা নাই গো তার



দেহের সাধন সর্বসার।



তীর্থব্রত যার জন্য



এ দেহের তার সকাল মিলে।'



পূর্বেই বলেছি, লালন শাহ ছিলেন আচার সর্বস্বতা ও প্রচলিত ছুৎমাগের বিরুদ্ধে, যার সাধনা ধর্মীয় সীমান্তে পুঁতে রাখা বিষ ফলক উপড়ে ফেলে মানবিক শস্য হয়ে দোলা দিয়ে যেতো। ধর্মীয় আচার সর্বস্বতা ও অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে লালনের দর্শন সৃজন করেছে অভেদ আত্মার নিবিড় মানবিক বন্ধন। লালন শাহের কথায় যা এভাবে শুনা যায়_



'সুন্নত দিলে হয় মুসলমান



নারীর তরে কী হয় বিধান



বামুন চিনে পৈতে প্রমাণ



বামনি চিনি কী ধরে।'



লালন শাহ তার আমৃত্যু সাধনায় পরম আত্মার সাথে নীরব নিবিড় বন্ধন গড়ে গেছেন। যেখানে স্বর্গের লোভ বা নরকের ভয় ছিল না। বরং তার চেয়ে মহৎ ও মানবিক চিন্তা বাউল লালন শাহকে করেছে বাউল জগতের মুকুটহীন সম্রাট। তার দর্শন ও সাধনার ফসল বিশ্বময় মানুষের মানবিক দিগন্তে ঘটে যাওয়া স্থায়ী রেনেসাঁ। জনসংখ্যা বা যে কোনো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও যে বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের সবক'টি দেশের মানুষ আজ সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তা হলো মানবাধিকার। ধর্ম, বংশ, অর্থ, বর্ণ, ক্ষমতা, সীমাহীন উপার্জনের বিষধর লোভ, লুটপাট বা আত্মসাৎ এর দম্ভ মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। কোনো প্রাণী কোনো প্রাণীকে হত্যা করছে না; যেভাবে মানুষ মানুষকে খুন, ধর্ষণ বা এসবের পর লাশ নিয়ে পৈশাচিকতা করতে পারে। আমরা নিজেদের সভ্য দাবি করলেও বিশ্ব আজ যুদ্ধের জ্বলন্ত কুণ্ড। যখন তখন যেখানে সেখানে সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় সভ্যতা কাঁদছে। কান পাতলেই বিবেক দংশিত হচ্ছে মানুষের অসহায় আর্তচিৎকারে। এই হত্যার প্রতিযোগিতা পৃথিবী নামক গ্রহের অন্য কোনো জীবের সাথে নয়। মানুষের সাথে মানুষের। দেশে দেশে মানবাধিকার কমিশন গঠিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে শক্তিশালী ও স্বাধীন মানবাধিকার। অথচ দিনের শুরুটাই হচ্ছে একটি মানুষের লাশ-লাশের বীভৎস ছবি, হত্যা-হানাহানি বা দখলদারিত্বের আদিমতা নিয়ে। প্রতিহিংসার রণাঙ্গনে বিধ্বস্ত মানুষগুলোকে আরেকবার প্রশান্তি দিতে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাউল সম্রাট লালনের দর্শন। সব পেরিয়ে এটাই ধ্রুব সত্য যে, লালন শাহের ভাব মোহনায় মিশে গিয়ে জয় করতে হবে অভাব, যুদ্ধ আর অবিশ্বাসের অজেয় রাজ্য।



শাহ বুলবুল : সাংবাদিক ও লেখক। 



shahbulbul@yahoo.com



 



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২০-সূরা : তা-হা


১৩৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহ্ নামে শুরু করছি।


 


৪৮। ‘আমাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করা হইয়াছে যে, শাস্তি তো তাহার জন্য, যে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরাইয়া লয়।’


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


আগে সময় সম্বন্ধে সচেতন হও, তারপর কাজ করো।


-সিন্ডেলা।


 


পরনিন্দাকারী বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।


  - হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)


 

ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৭,৫১,৬৫৯ ১৬,৮০,১৩,৪১৫
সুস্থ ৭,৩২,৮১০ ১৪,৯৩,৫৬,৭৪৮
মৃত্যু ১২,৪৪১ ৩৪,৮৮,২৩৭
দেশ ২০০ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
১৮৫৫৮৬৪
পুরোন সংখ্যা